পঞ্চম শ্রেণি জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রশ্নোত্তর: বিশ্বের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বাড়তি জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, ভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজনও বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাগুলো কী কী? এই সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান কি আমাদের কাছে আছে? এই সমস্যাগুলো আমরা কীভাবে সমাধান করতে পারি?
১. জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের চাহিদা-
(১) জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব:
১৮০০ সালের শুরুর দিকে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০০ কোটি। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৭০০ কোটি লোক বসবাস করে। অর্থাৎ ২০০ বছরে বিশ্বে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬০০ কোটি। ২০১১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হয় ১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ ৭২ হাজার ৩৬৪ জন। ১৯৭০ সালে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬০ লক্ষ। ৪০ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব হলো প্রতি একক জায়গায় বসবাসরত মোট লোকসংখ্যা। মোট জনসংখ্যাকে ক্ষেত্রফল দ্বারা ভাগ করে খুব সহজেই জনসংখ্যার ঘনত্ব পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি।
(২) জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের চাহিদা:
প্রশ্ন : যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় তাহলে আমাদের কী ঘটবে?
জনসংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে মানুষের চাহিদাও তত বাড়বে। এতে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ বাড়বে। বাড়তি চাহিদা আমাদের জীবনে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং ভূমি ইত্যাদির ঘাটতি দেখা দেবে। মানুষ সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে। কারণ জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হলে জীবাণু দ্রুত ছড়ায়। চিকিৎসা এবং শিক্ষার সুযোগ কমে যেতে পারে। ব্যবহারের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
২. পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব
পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বাড়তি শস্য উৎপাদন এবং পশুপালনের জন্য মানুষ বন উজাড় করছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং কলকারখানা তৈরিতেও অধিক জমি ব্যবহার করছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন হয়। জীবের আবাসস্থল ধ্বংস হয় এবং জীব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। এছাড়া বনভূমি ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয় এবং ভূমিধ্বস হয়।
কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভিদের ভালো বৃদ্ধি এবং অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাটি এবং পানি দূষিত হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কলকারখানায় পণ্য তৈরি হয়। মানুষ যাতায়াতের জন্য যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে। কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস বায়ু দূষিত করছে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এসিড বৃষ্টি হচ্ছে।
৩. জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা
জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান
বাড়তি মানুষের চাহিদা পূরণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অধিক খাদ্য উৎপাদনে সাহায্য করছে। মানুষ বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে কম সময়ে বেশি খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে, জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিসম্পন্ন, রোগ প্রতিরোধী এবং অধিক উৎপাদনশীল ফসল উদ্ভাবন করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কমিয়ে শক্তি সংরক্ষণে ও দূষণ কমাতে সহায়তা করে। মানুষ সৌর প্যানেলের মতো প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে যা নবায়নযোগ্য সম্পদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই প্রযুক্তি অনবায়নযোগ্য শক্তির বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ যাতায়াতের জন্য নতুন প্রযুক্তি “হাইব্রিড গাড়ি” উদ্ভাবন করেছে। এই গাড়ি বিদ্যুৎ ও তেল উভয় জ্বালানি ব্যবহার করেই চলতে পারে। যা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে ভূমিকা রাখছে।
বিজ্ঞান শেখার প্রয়োজনীয়তা
জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখা অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের আচরণ পরিবর্তনে এবং বিজ্ঞানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১. সঠিক উত্তরে টিক চিহ্ন (✔) দিই।
১) নিচের কোনটি মানুষের মৌলিক চাহিদা?
ক. বিনোদন
খ. খাদ্য✔
গ. হাইব্রিড গাড়ি
ঘ. খেলাধুলা
২) জনসংখ্যার ঘনত্ব হলো –
ক. প্রতি একক জায়গায় লোকসংখ্যা✔
খ. প্রতি মানুষের জন্য ভূমির পরিমাণ
গ. প্রতি একক ক্ষেত্রফলে মানুষের ওজন
ঘ. প্রতি মানুষের ওজনের জন্য ভূমির পরিমাণ
৩) কোনটি অনবায়নযোগ্য শক্তির উৎস?
ক. পানি
খ. গাছ
গ. বাতাস
ঘ. কয়লা✔
৪) জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কোনটি ঘটে?
ক. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন✔
খ. জনসংখ্যা বৃদ্ধি
গ. ভূমিকম্প
ঘ. ভূমিক্ষয়
২. সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১) জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কিসের চাহিদা বাড়বে?
উত্তর: জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা, ভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বাড়বে।
২) পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৩টি ক্ষতিকর প্রভাব লিখি।
উত্তর: পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৩টি ক্ষতিকর প্রভাব নিম্নরূপ-
১. বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং ফসলের জমির ব্যবস্থা করতে গিয়ে নির্বিচারে বন উজাড় করা হচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
২. অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে যা মাটি ও পানিকে দূষিত করছে।
৩. জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে কলকারখানা ও যানবাহন। এসকল যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া বায়ু দূষণ ঘটায়।
৩) অধিক খাদ্য উৎপাদনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কীভাবে অবদান রাখছে?
উত্তর: বাড়তি মানুষের চাহিদা পূরণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অধিক খাদ্য উৎপাদনে সাহায্য করছে। মানুষ বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে কম সময়ে বেশি খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে, জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিসম্পন্ন, রোগ প্রতিরোধী এবং অধিক উৎপাদনশীল ফসল উদ্ভাবন করা হচ্ছে। যা অধিক খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে। এভাবেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অধিক খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে।
| গাইড ও সাজেশন পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করো 👉 Install Now |
৩. বর্ণনামূলক প্রশ্ন:
১) আমরা কেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিখছি?
উত্তর : জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখা অত্যন্ত জরুরি।
২) মানুষ কেন কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছে?
উত্তর: জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে মানুষের সব ধরনের চাহিদা। বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজন হচ্ছে অতিরিক্ত খাদ্যের। সেই সাথে হ্রাস পাচ্ছে ফসলের জমি। ফলে খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমাদের অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করতে হচ্ছে। তাই একই জমি বারবার চাষ করতে হচ্ছে। ফলে জমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। আর এ অনুর্বর জমিতে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ দমনে মানুষ কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছে।
৩) বনভূমি ধ্বংসের ফলে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়ছে?
উত্তর: বনভূমি ধ্বংসের ফলে পরিবেশের উপর নিম্নোক্ত প্রভাবগুলো পড়ছে-
১. বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন ঘটছে।
২. জীবের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
৩. জীবজন্তু বিলুপ্ত হচ্ছে।
৪. ভূমিক্ষয় ও ভূমিধ্বস বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৫. গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।
৪) জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মানুষ কেন সহজেই রোগাক্রান্ত হয়?
উত্তর: জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মানুষের চাহিদাগুলোও বৃদ্ধি পায়।
এ বাড়তি চাহিদার সাথে সীমিত সম্পদ তাল মিলাতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় নানা অসংগতি ও ব্যাহত হয় চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ। আর শিক্ষার অভাবে বাড়ছে অসচেতনতা। অন্যদিকে ভূমি ঘাটতির কারণে বৃদ্ধি পায় জনসংখ্যার ঘনত্ব। ফলে অল্প জায়গায় ঠাসাঠাসি করে মানুষ বসবাস করছে। আর অধিক জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে রোগ জীবাণু দ্রুত ছড়ায়। একদিকে রোগ জীবাণুর বিস্তার আর অন্যদিকে চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাবের কারণে মানুষ খুব সহজেই রোগাক্রান্ত হচ্ছে।
Codehorse Learn Free